ভোট এলো– আপনি কী করবেন?
ভোট দেবেন? কাকে দেবেন? কেন দেবেন?
তারও আগের প্রশ্ন হলো, আদৌ ভোট হবে কি? না হলে? হলেও সেটা কি সহিংসতামুক্ত “ইতিহাসের সেরা ভোট” হবে?
এমন হাজারটা প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো ভোট দিলে আপনার কী হবে? এই ভোটের চিৎকার চলছে বহু দিন ধরে। এখন ভোটের তারিখও পড়েছে। ভোট একেবারে দোরগোড়ায়। বড় পার্টিগুলো খেয়ে না খেয়ে নেমেছে। ছোটগুলো এর ওর সাথে ভিড়ছে। সবার লক্ষ্যই ক্ষমতা। তারা যে-শ্রেণিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে, বড় বড় ধনীরা এবং তাদের বিদেশি প্রভুরা, তারা তো ক্ষমতায় রয়েছেই। তাহলে আর ভোটের দরকার কী? জনগণের ভোট দেবার দরকার কী?
এটাকে বলে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের একটা খেল। প্রথমত, যে শ্রেণিগুলো ক্ষমতাকে চালায় তারা বহু গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তাদের মাঝে রয়েছে বিবিধ মতপার্থক্য, স্বার্থ নিয়ে চরম খেয়োখেয়ি। তাই, তারা একটা পদ্ধতি বের করেছে যাতে কারা সরকার গঠন করবে এবং ক্ষমতার হালুয়া-রুটির বড় ভাগটা খাবে সেটা নির্ধারণ করা হয় ভোটে। যদিও আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের অন্তর্দ্বন্দ্বে হয় ভোট বাতিল হয়, নতুবা হাসিনা-মার্কা ভোট হয়। দ্বিতীয়ত, তারা এই ভোটের দ্বারা জনগণকেও দেখাতে চায় যে, দেখো, আমাদের ক্ষমতাটা হয়েছে তোমাদের মতামতের ভিত্তিতেই। অর্থাৎ, তোমরাই ক্ষমতায়।
কিন্তু জনগণ যে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যান না, এবং তাদের শ্রেণিগত স্বার্থ অর্জন করতে পারেন না, সেটা বিগত বহু বছরের ভোটে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। আপনি একজন শ্রমিক– গার্মেন্ট শ্রমিক, বা পরিবহণ শ্রমিক। অথবা অন্য ধরনের শ্রমিক বা শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষ– যেমন, গৃহকর্মী, হকার, ফেরিওয়ালা, বা ছোটো ব্যবসায়ী। আপনি তো আগে বহুবার ভোট দিয়েছেন। বা দেননি। এইসব ভোটে আপনার ভাগ্যের কখনো কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে? আপনি একজন কৃষক– গরিব বা মাঝারি ধরনের। গ্রামাঞ্চলে আপনার কী ক্ষমতা হয়েছে? নিপীড়িত সংখ্যালঘু বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা নারীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে বিগত ৫৪ বছরের স্বাধীনতায়? আপনি ভোট দিয়েছেন নৌকায়, ধানের শীষে, দাঁড়িপাল্লায় বা লাঙ্গলে। ক্ষমতায় কিন্তু গিয়েছে বড় বড় গার্মেন্ট মালিক, ব্যবসায়ী, বড় বড় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার ও আমলারা এবং লুটেরা সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি, ব্যাংক লুটকারী ও সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ। যাদের পেছনে আবার আশীর্বাদ থাকে ভারত, আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ, অথবা রাশিয়া বা চীনের মতো বিদেশি শোষকদের।
ঠিক সে কারণেই তারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের শ্রেণির স্বার্থটাই দেখে, আর তাদের বিদেশি প্রভুদের স্বার্থটা দেখে। যেমন, হাসিনা ভারতের স্বার্থ দেখেছিল, আমেরিকা-চীন-রাশিয়ার স্বার্থও দেখেছিল, আর দেখেছিল কীভাবে যতদিন পারা যায় ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে লুটপাট, অবাধ শোষণ, বিদেশে অর্থ পাচার, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, চুরি-দুর্নীতি, খুন-গুম করে নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিল করা যায়।
আপনার স্বার্থ কেউ দেখেনি ও দেখে না। কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাটা আপনার হাতে ছিল না ও নেই। আপনার শ্রেণিস্বার্থে কোনো কর্মসূচি তাদের ছিল না ও নেই। এটাই রাজনীতির আসল কথা। এটাই হলো বিদ্যমান ব্যবস্থা।
বিগত ’২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা উচ্ছেদ হবার পর নতুন বাংলাদেশ, ২য় স্বাধীনতা, নতুন বন্দোবস্ত, ইনসাফ, এমনকি বিপ্লব– এসব কথা কম শোনা যায়নি। এতদিনে তাদের প্রায় সকলেই বলছে– মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অনেকেই বলছে, ছাত্র-তরুণ-জনতার প্রাণ বলিদান সফল হয়নি। এটা দেখে তাদের কেউ কেউ আবার বলছে, নতুন বন্দোবস্ত এখন তারা করবে। ইনসাফ কায়েম করবে। ভোট করে কী সেই ইনসাফ ও নতুন বন্দোবস্তের কর্মসূচি? কেউ জানে না। কেউ বলছে ইসলাম, কেউ-বা ৩১ দফা বা জুলাই সনদ নতুন সংবিধান। সেগুলোতে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র জনগণের যারা শত্রু তাদের ক্ষমতা উচ্ছেদের কোনো কথা নেই। তাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য কিছু সদকা আর ভিক্ষার কথা রয়েছে। সেগুলোও ক্ষমতায় গিয়ে তারা পালন করবে না বললেই চলে। কোনো শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র, নিপীড়িত নারী-আদিবাসী কি জানেন ঐসব ইশতেহারে তাদের মৌলিক স্বার্থ কী কী রয়েছে?
যারা ভোটে দাঁড়াচ্ছে তাদের মুখগুলোকে কিছুটা দেখা যাক। প্রধান আলোচনা বিএনপি-কে নিয়ে। তারাই নাকি ভোটে পাশ করবে। যদি করে, তাতে কী পাওয়া যাবে? তারা তো আগেও অনেকবার ক্ষমতায় ছিল। এখন বিএনপি’র নব্য নেতা তারেক রহমান বলছেন তার নাকি একটি প্ল্যান রয়েছে। সেটা অবশ্য এখনো জনগণ জানেনই না। তারেকের পকেটেই সেটা এখনো রয়েছে। তবে নিশ্চিত যে, সেটা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদলানোর কোনো প্ল্যান নয়। দ্বিতীয় দল বলা হচ্ছে জামাতসহ ধর্মবাদীদেরকে। তারা বাজার দখলের জন্য দুটো কার্ড ছেড়েছে। এক– বিএনপি-আওয়ামী লীগকে দেখেছেন, এবার অন্তত একবার আমাদের সুযোগ দিন। দুই– ইসলাম কায়েম। আসলে প্রথমটি হলো একটি মিথ্যা কথা। জামাতকে ১৯৪৮ সাল থেকেই জনগণ দেখছেন। বেশি করে দেখেছেন ’৭১-সালে। বাংলাদেশ আমলেও তারা বিএনপি’র সাথে ক্ষমতায় ছিল। তারা আওয়ামী লীগ ও এরশাদের সাথেও খাতির করেছে। অনেক কিছুই তারা করেছে বুর্জোয়া রাজনীতির পথ ধরে। এগুলো ইসলাম কিনা সেটা ধর্মীয় নেতারাই ভালো বলবেন। তবে বহু ধর্মীয় আলেম তাদের জোটকে ইসলামের নামে জনগণের সাথে প্রতারণাও বলেছেন। তবে ধর্মের শাসন নামে কী জিনিস চলছে, সেটা বিশ্বের বহু দেশেই দেখা যাবে। আজকের বিশ্বে খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু, ইসলাম– যেকোনো ধর্মের নামে রাষ্ট্রীয় শাসন সুষ্পষ্ট ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র। দূর অতীতে না গিয়ে বর্তমান বিশ্বে ইসরায়েল, আফগানিস্তান, আমেরিকার ট্রাম্প-শাসন, ইরান, সৌদি আরব, মোদির ভারত– এদেশগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। এরা নিজ নিজ দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে রেখেছে, যেখানে নিপীড়িত জনগণের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। আর এই ধর্মবাদী ফ্যাসিস্টদের সাথেই জোট বেধেছে হাসিনা-ফ্যাসিবাদ বিরোধী অভ্যুত্থানের কৃতিত্বের দাবিদার ও নতুন বন্দোবস্তের ফেরিওয়ালা এনসিপি। তাই দেখে ওদেরই নারী নেতৃত্বদের বড় অংশসহ বহু আন্তরিক নেতা-কর্মীরা লজ্জা পেয়ে দল ত্যাগ করেছে।
এখন তো বোঝা যাচ্ছে, কেন অভ্যুত্থানটির পরও জনগণের কোনো ক্ষমতা হয়নি, কেন নতুন কোনো বন্দোবস্ত জনগণের স্বার্থে হয়নি, কেন নতুন কোনো বাংলাদেশ হয়নি? এটা পুরোনো দেশেরই একটি নতুন সংস্করণ মাত্র। তারা যে সবাই মিলে কেন আমেরিকার বিশ্বস্ত মিত্র ড.ইউনূসকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল সেটা কি স্পষ্ট হচ্ছে না?
উদ্দেশ্যটা ছিল পুরোনো ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করা, গুছিয়ে তোলা। এর মাঝে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা, সমালোচনা– এগুলো তাদের গোষ্ঠীগত কোন্দল মাত্র। বিপুল সংখ্যক আন্তরিক সংগ্রামীকে রাজনৈতিক অসচেতনতায় ফেলে বিপথগামী করার যে কাজটি এনসিপিসহ এই তরুণ ও নতুনদের একাংশ করেছে তার থেকে প্রকৃত বিপ্লবাকাঙ্ক্ষীদের বেরিয়ে আসা ও আত্মজিঞ্জাসা করার এটা শ্রেষ্ঠ সময়। শর্টকাট বিপ্লবের পথ থেকে সরে এসে প্রকৃত বিপ্লবের জন্য সচেতন হওয়াটাই এখনকার রাজনীতির একমাত্র কাজ হতে পারে। এইসব পচা-গলা বুর্জোয়া রাজনীতির কানাগলিতে পথঘোরা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে।
* জনগণ আগামীতে নিশ্চিতভাবে দেখতে পাবেন তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন এসব ভোটবাজীতে হয়নি। বিশেষ করে যখন কিনা কিছু চিহ্নিত নব্য ফ্যাসিস্টরাও গণতন্ত্র আর নতুন দেশের কথা বলে জনগণকে প্রতারণা করছে, তখন বিশেষভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের বিষয়টাতেও গুরুত্ব দিতে হবে। এইসব প্রতারকরা বলছে তারা ফ্যাসিবাদকে উচ্ছেদ করেছে। আবার এখন তাদেরই কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্র ও সমাজের বহু জায়গায় হাসিনা-আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদীরা বহাল রয়েছে। তারা ষড়যন্ত্র করছে ভারতের সাথে মিলে– নিশ্চিত।
কিন্তু এটাও তো গোপন নয় যে, বিএনপি, জামাত, এনসিপিরা আওয়ামী পন্থিদেরকে দলে ভিড়ানোর জন্যও কমপিটিশন লাগিয়েছে। কিন্তু শুধু হাসিনা-আওয়ামী লীগই তো ফ্যাসিবাদী নয়। জামাত কী? এই যুগে ধর্মবাদী রাজনীতি কী? বিরাজনীতিকরণ কী, যার গুরু ছিলেন ও রয়েছেন ইউনূস এবং তার পেছনে লাইন ধরা সব ‘তৃতীয় শক্তি’র দল। ব্যবস্থাটির মুলে রয়েছে স্বৈরতন্ত্র, যা অবিরত বিভিন্ন রূপে ফ্যাসিবাদ জন্ম দেয়। যদিও ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদ– তা ’৭১-এর চেতনার নামেই হোক, বা জুলাই-চেতনার নামে হোক, ধর্মের নামে হোক বা সংস্কারের নামে হোক– অবশ্যই ব্যবস্থার অন্যান্য রাজনৈতিক রূপগুলোর তুলনায় বেশি বিপজ্জনক।
তাই, ফ্যাসিবাদ ও প্রকাশ্য স্বৈরতন্ত্র বিরোধী (সামরিক শাসন বা বিরাজনীতিকরণ) লড়াইটাও বিশেষভাবে জারি রাখতে হবে। যদিও এরা সবাই বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করে, লালন করে, পরিচালনা করে, যাদের সাথে আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আওয়াজে ছাত্র-নেতৃত্বদের একাংশও জড়িয়ে গেছে। বুঝে বা না বুঝে। তবে দুধের সরটা তারা খাচ্ছে ঠিকই। যে ব্যবস্থাটিকে আমরা বলে থাকি নয়া উপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। এর অর্থ হলো, এখানে ক্ষমতা হলো– আমেরিকাসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, তাদের দালাল বড় ধনী শ্রেণি এবং আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার হোতারা। যাদের সকলের শোষণ-লুণ্ঠনকে উচ্ছেদ না করে কোনো বিপ্লব, কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধান, কোনো নতুন বাংলাদেশ হতে পারে না। কোনো ইনসাফ হতে পারে না। কোনো সাম্য হতে পারে না। বৈষম্যের অবসান হতে পারে না।
সুতরাং এই ব্যবস্থার ভোটে আপনার কোনো ফায়দা নেই। আপনি শ্রমিক, আপনি কৃষক, আপনি দরিদ্র শ্রমজীবী বা ক্ষুদে ব্যবসায়ী, সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিপীড়িত নারী, আদিবাসী, সংগ্রামী ছাত্র-তরুণ– আপনার কর্তব্য হলো জানবাজি বীরত্বপূর্ণ লড়াই করা, যেমনটা করেছেন জুলাই-অভ্যুত্থানে শহরের ছাত্র-তরুণরা, ’৭১-সালে সারা দেশের জনগণ, ’৬৯ ও ’৯০-এর আন্দোলন ও অভ্যুত্থানেও। কিন্তু সেটা করতে হবে নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য, নিজেদের শ্রেণি/গোষ্ঠী স্বার্থের বিপ্লবী কর্মসূচিতে সচেতন হয়ে তাকে প্রতিষ্ঠার জন্য।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ভোট এলো– আপনি কী করবেন?
ভোট দেবেন? কাকে দেবেন? কেন দেবেন?
তারও আগের প্রশ্ন হলো, আদৌ ভোট হবে কি? না হলে? হলেও সেটা কি সহিংসতামুক্ত “ইতিহাসের সেরা ভোট” হবে?
এমন হাজারটা প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো ভোট দিলে আপনার কী হবে? এই ভোটের চিৎকার চলছে বহু দিন ধরে। এখন ভোটের তারিখও পড়েছে। ভোট একেবারে দোরগোড়ায়। বড় পার্টিগুলো খেয়ে না খেয়ে নেমেছে। ছোটগুলো এর ওর সাথে ভিড়ছে। সবার লক্ষ্যই ক্ষমতা। তারা যে-শ্রেণিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে, বড় বড় ধনীরা এবং তাদের বিদেশি প্রভুরা, তারা তো ক্ষমতায় রয়েছেই। তাহলে আর ভোটের দরকার কী? জনগণের ভোট দেবার দরকার কী?
এটাকে বলে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের একটা খেল। প্রথমত, যে শ্রেণিগুলো ক্ষমতাকে চালায় তারা বহু গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তাদের মাঝে রয়েছে বিবিধ মতপার্থক্য, স্বার্থ নিয়ে চরম খেয়োখেয়ি। তাই, তারা একটা পদ্ধতি বের করেছে যাতে কারা সরকার গঠন করবে এবং ক্ষমতার হালুয়া-রুটির বড় ভাগটা খাবে সেটা নির্ধারণ করা হয় ভোটে। যদিও আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের অন্তর্দ্বন্দ্বে হয় ভোট বাতিল হয়, নতুবা হাসিনা-মার্কা ভোট হয়। দ্বিতীয়ত, তারা এই ভোটের দ্বারা জনগণকেও দেখাতে চায় যে, দেখো, আমাদের ক্ষমতাটা হয়েছে তোমাদের মতামতের ভিত্তিতেই। অর্থাৎ, তোমরাই ক্ষমতায়।
কিন্তু জনগণ যে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যান না, এবং তাদের শ্রেণিগত স্বার্থ অর্জন করতে পারেন না, সেটা বিগত বহু বছরের ভোটে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। আপনি একজন শ্রমিক– গার্মেন্ট শ্রমিক, বা পরিবহণ শ্রমিক। অথবা অন্য ধরনের শ্রমিক বা শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষ– যেমন, গৃহকর্মী, হকার, ফেরিওয়ালা, বা ছোটো ব্যবসায়ী। আপনি তো আগে বহুবার ভোট দিয়েছেন। বা দেননি। এইসব ভোটে আপনার ভাগ্যের কখনো কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে? আপনি একজন কৃষক– গরিব বা মাঝারি ধরনের। গ্রামাঞ্চলে আপনার কী ক্ষমতা হয়েছে? নিপীড়িত সংখ্যালঘু বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা নারীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে বিগত ৫৪ বছরের স্বাধীনতায়? আপনি ভোট দিয়েছেন নৌকায়, ধানের শীষে, দাঁড়িপাল্লায় বা লাঙ্গলে। ক্ষমতায় কিন্তু গিয়েছে বড় বড় গার্মেন্ট মালিক, ব্যবসায়ী, বড় বড় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার ও আমলারা এবং লুটেরা সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি, ব্যাংক লুটকারী ও সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ। যাদের পেছনে আবার আশীর্বাদ থাকে ভারত, আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ, অথবা রাশিয়া বা চীনের মতো বিদেশি শোষকদের।
ঠিক সে কারণেই তারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের শ্রেণির স্বার্থটাই দেখে, আর তাদের বিদেশি প্রভুদের স্বার্থটা দেখে। যেমন, হাসিনা ভারতের স্বার্থ দেখেছিল, আমেরিকা-চীন-রাশিয়ার স্বার্থও দেখেছিল, আর দেখেছিল কীভাবে যতদিন পারা যায় ক্ষমতা আঁকড়ে থেকে লুটপাট, অবাধ শোষণ, বিদেশে অর্থ পাচার, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, চুরি-দুর্নীতি, খুন-গুম করে নিজেদের গোষ্ঠী স্বার্থ হাসিল করা যায়।
আপনার স্বার্থ কেউ দেখেনি ও দেখে না। কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাটা আপনার হাতে ছিল না ও নেই। আপনার শ্রেণিস্বার্থে কোনো কর্মসূচি তাদের ছিল না ও নেই। এটাই রাজনীতির আসল কথা। এটাই হলো বিদ্যমান ব্যবস্থা।
বিগত ’২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা উচ্ছেদ হবার পর নতুন বাংলাদেশ, ২য় স্বাধীনতা, নতুন বন্দোবস্ত, ইনসাফ, এমনকি বিপ্লব– এসব কথা কম শোনা যায়নি। এতদিনে তাদের প্রায় সকলেই বলছে– মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অনেকেই বলছে, ছাত্র-তরুণ-জনতার প্রাণ বলিদান সফল হয়নি। এটা দেখে তাদের কেউ কেউ আবার বলছে, নতুন বন্দোবস্ত এখন তারা করবে। ইনসাফ কায়েম করবে। ভোট করে কী সেই ইনসাফ ও নতুন বন্দোবস্তের কর্মসূচি? কেউ জানে না। কেউ বলছে ইসলাম, কেউ-বা ৩১ দফা বা জুলাই সনদ নতুন সংবিধান। সেগুলোতে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র জনগণের যারা শত্রু তাদের ক্ষমতা উচ্ছেদের কোনো কথা নেই। তাদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য কিছু সদকা আর ভিক্ষার কথা রয়েছে। সেগুলোও ক্ষমতায় গিয়ে তারা পালন করবে না বললেই চলে। কোনো শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র, নিপীড়িত নারী-আদিবাসী কি জানেন ঐসব ইশতেহারে তাদের মৌলিক স্বার্থ কী কী রয়েছে?
যারা ভোটে দাঁড়াচ্ছে তাদের মুখগুলোকে কিছুটা দেখা যাক। প্রধান আলোচনা বিএনপি-কে নিয়ে। তারাই নাকি ভোটে পাশ করবে। যদি করে, তাতে কী পাওয়া যাবে? তারা তো আগেও অনেকবার ক্ষমতায় ছিল। এখন বিএনপি’র নব্য নেতা তারেক রহমান বলছেন তার নাকি একটি প্ল্যান রয়েছে। সেটা অবশ্য এখনো জনগণ জানেনই না। তারেকের পকেটেই সেটা এখনো রয়েছে। তবে নিশ্চিত যে, সেটা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদলানোর কোনো প্ল্যান নয়। দ্বিতীয় দল বলা হচ্ছে জামাতসহ ধর্মবাদীদেরকে। তারা বাজার দখলের জন্য দুটো কার্ড ছেড়েছে। এক– বিএনপি-আওয়ামী লীগকে দেখেছেন, এবার অন্তত একবার আমাদের সুযোগ দিন। দুই– ইসলাম কায়েম। আসলে প্রথমটি হলো একটি মিথ্যা কথা। জামাতকে ১৯৪৮ সাল থেকেই জনগণ দেখছেন। বেশি করে দেখেছেন ’৭১-সালে। বাংলাদেশ আমলেও তারা বিএনপি’র সাথে ক্ষমতায় ছিল। তারা আওয়ামী লীগ ও এরশাদের সাথেও খাতির করেছে। অনেক কিছুই তারা করেছে বুর্জোয়া রাজনীতির পথ ধরে। এগুলো ইসলাম কিনা সেটা ধর্মীয় নেতারাই ভালো বলবেন। তবে বহু ধর্মীয় আলেম তাদের জোটকে ইসলামের নামে জনগণের সাথে প্রতারণাও বলেছেন। তবে ধর্মের শাসন নামে কী জিনিস চলছে, সেটা বিশ্বের বহু দেশেই দেখা যাবে। আজকের বিশ্বে খ্রিষ্টান, ইহুদি, হিন্দু, ইসলাম– যেকোনো ধর্মের নামে রাষ্ট্রীয় শাসন সুষ্পষ্ট ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র। দূর অতীতে না গিয়ে বর্তমান বিশ্বে ইসরায়েল, আফগানিস্তান, আমেরিকার ট্রাম্প-শাসন, ইরান, সৌদি আরব, মোদির ভারত– এদেশগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। এরা নিজ নিজ দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করে রেখেছে, যেখানে নিপীড়িত জনগণের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। আর এই ধর্মবাদী ফ্যাসিস্টদের সাথেই জোট বেধেছে হাসিনা-ফ্যাসিবাদ বিরোধী অভ্যুত্থানের কৃতিত্বের দাবিদার ও নতুন বন্দোবস্তের ফেরিওয়ালা এনসিপি। তাই দেখে ওদেরই নারী নেতৃত্বদের বড় অংশসহ বহু আন্তরিক নেতা-কর্মীরা লজ্জা পেয়ে দল ত্যাগ করেছে।
এখন তো বোঝা যাচ্ছে, কেন অভ্যুত্থানটির পরও জনগণের কোনো ক্ষমতা হয়নি, কেন নতুন কোনো বন্দোবস্ত জনগণের স্বার্থে হয়নি, কেন নতুন কোনো বাংলাদেশ হয়নি? এটা পুরোনো দেশেরই একটি নতুন সংস্করণ মাত্র। তারা যে সবাই মিলে কেন আমেরিকার বিশ্বস্ত মিত্র ড.ইউনূসকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল সেটা কি স্পষ্ট হচ্ছে না?
উদ্দেশ্যটা ছিল পুরোনো ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করা, গুছিয়ে তোলা। এর মাঝে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা, সমালোচনা– এগুলো তাদের গোষ্ঠীগত কোন্দল মাত্র। বিপুল সংখ্যক আন্তরিক সংগ্রামীকে রাজনৈতিক অসচেতনতায় ফেলে বিপথগামী করার যে কাজটি এনসিপিসহ এই তরুণ ও নতুনদের একাংশ করেছে তার থেকে প্রকৃত বিপ্লবাকাঙ্ক্ষীদের বেরিয়ে আসা ও আত্মজিঞ্জাসা করার এটা শ্রেষ্ঠ সময়। শর্টকাট বিপ্লবের পথ থেকে সরে এসে প্রকৃত বিপ্লবের জন্য সচেতন হওয়াটাই এখনকার রাজনীতির একমাত্র কাজ হতে পারে। এইসব পচা-গলা বুর্জোয়া রাজনীতির কানাগলিতে পথঘোরা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে।
* জনগণ আগামীতে নিশ্চিতভাবে দেখতে পাবেন তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন এসব ভোটবাজীতে হয়নি। বিশেষ করে যখন কিনা কিছু চিহ্নিত নব্য ফ্যাসিস্টরাও গণতন্ত্র আর নতুন দেশের কথা বলে জনগণকে প্রতারণা করছে, তখন বিশেষভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের বিষয়টাতেও গুরুত্ব দিতে হবে। এইসব প্রতারকরা বলছে তারা ফ্যাসিবাদকে উচ্ছেদ করেছে। আবার এখন তাদেরই কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্র ও সমাজের বহু জায়গায় হাসিনা-আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদীরা বহাল রয়েছে। তারা ষড়যন্ত্র করছে ভারতের সাথে মিলে– নিশ্চিত।
কিন্তু এটাও তো গোপন নয় যে, বিএনপি, জামাত, এনসিপিরা আওয়ামী পন্থিদেরকে দলে ভিড়ানোর জন্যও কমপিটিশন লাগিয়েছে। কিন্তু শুধু হাসিনা-আওয়ামী লীগই তো ফ্যাসিবাদী নয়। জামাত কী? এই যুগে ধর্মবাদী রাজনীতি কী? বিরাজনীতিকরণ কী, যার গুরু ছিলেন ও রয়েছেন ইউনূস এবং তার পেছনে লাইন ধরা সব ‘তৃতীয় শক্তি’র দল। ব্যবস্থাটির মুলে রয়েছে স্বৈরতন্ত্র, যা অবিরত বিভিন্ন রূপে ফ্যাসিবাদ জন্ম দেয়। যদিও ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদ– তা ’৭১-এর চেতনার নামেই হোক, বা জুলাই-চেতনার নামে হোক, ধর্মের নামে হোক বা সংস্কারের নামে হোক– অবশ্যই ব্যবস্থার অন্যান্য রাজনৈতিক রূপগুলোর তুলনায় বেশি বিপজ্জনক।
তাই, ফ্যাসিবাদ ও প্রকাশ্য স্বৈরতন্ত্র বিরোধী (সামরিক শাসন বা বিরাজনীতিকরণ) লড়াইটাও বিশেষভাবে জারি রাখতে হবে। যদিও এরা সবাই বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করে, লালন করে, পরিচালনা করে, যাদের সাথে আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আওয়াজে ছাত্র-নেতৃত্বদের একাংশও জড়িয়ে গেছে। বুঝে বা না বুঝে। তবে দুধের সরটা তারা খাচ্ছে ঠিকই। যে ব্যবস্থাটিকে আমরা বলে থাকি নয়া উপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। এর অর্থ হলো, এখানে ক্ষমতা হলো– আমেরিকাসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, তাদের দালাল বড় ধনী শ্রেণি এবং আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার হোতারা। যাদের সকলের শোষণ-লুণ্ঠনকে উচ্ছেদ না করে কোনো বিপ্লব, কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধান, কোনো নতুন বাংলাদেশ হতে পারে না। কোনো ইনসাফ হতে পারে না। কোনো সাম্য হতে পারে না। বৈষম্যের অবসান হতে পারে না।
সুতরাং এই ব্যবস্থার ভোটে আপনার কোনো ফায়দা নেই। আপনি শ্রমিক, আপনি কৃষক, আপনি দরিদ্র শ্রমজীবী বা ক্ষুদে ব্যবসায়ী, সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিপীড়িত নারী, আদিবাসী, সংগ্রামী ছাত্র-তরুণ– আপনার কর্তব্য হলো জানবাজি বীরত্বপূর্ণ লড়াই করা, যেমনটা করেছেন জুলাই-অভ্যুত্থানে শহরের ছাত্র-তরুণরা, ’৭১-সালে সারা দেশের জনগণ, ’৬৯ ও ’৯০-এর আন্দোলন ও অভ্যুত্থানেও। কিন্তু সেটা করতে হবে নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য, নিজেদের শ্রেণি/গোষ্ঠী স্বার্থের বিপ্লবী কর্মসূচিতে সচেতন হয়ে তাকে প্রতিষ্ঠার জন্য।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র
